দুলালের আষ্কারায়ই আলালদের বখে যাওয়া

0
IQSHA IT

রুদ্র রুহান, বরগুনা:-
ছেলেদের বখাটে পনায় বাবার ছিল প্রত্যক্ষ সমর্থন। কাউকে কুপিয়ে যখম অথবা মারধর কিংবা লাঞ্চিতের খবরে শাসন তো দুরে থাক, বরং সন্তানদের হেন অপকর্মে নিজেকে গর্বিত পিতা মনে করতে। বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের মুল আসামী দুই সহোদর রিফাত ও রিশান ফরাজীর বাবা দুলাল ফরাজী সম্পর্কে এমন তথ্যই দিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। দিনভর অনুসন্ধানে বেশ দুলাল সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল ফরাজীর পৈত্রিক বাড়ি সদর উপজেলার ৬নং বুড়িরচর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বরগুনা পৌরসভায় চার নং ওয়ার্ডের ধানসীঁড়ি সড়কে জমি কিনে বাড়ি তৈরী করেন। সেখানেই পর্যাক্রমে জন্ম ও বেড়ে ওঠা রিফাত রিশানের। বড় ছেলে রিফাত কিশোর বয়স থেকেই বখাটে স্বভাবের ছিল। মাধ্যমিকের স্তর অতিক্রমের আগেই পড়াশোনা সাঙ্গ হয় তার। ছোটো ছেলে রিশান বরগুনা সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের ২য় বর্ষে অধ্যায়নত। পড়াশোনায় মেধাবী হলেও বড় ভাইয়ের আছড় লাগে রিশানের। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ‘বড় ভাই’ হওয়ার নেশায় পেয়ে বসে উভয়কে। ‘বড় ভাই’ হওয়ার মিশনে কারণে অকারণে অথবা তুচ্ছ কোনো বড় ছোট বাছ বিছার ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে নানা শ্রেণিপেশার লোকজনকে লঞ্চিত করতে থাকে। ইত্যবসরে রিফাত শরীফ হত্যায় মুল অভিযুক্ত এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাকদব্যবসায়ী নয়ন বন্ডের সাথে রিফাত ফরাজীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। ২০১৭ সালের দিকে তৈরী বন্ডের ০০৭ গ্রুপ। গ্রুপে সহযোগীদের পাশাপাশি যুক্ত হয় বেশ কিছু উঠতি তরুণ। এলাকায় নতুন কোনো তরুণের আকষ্মিক আগমন ঘটলে তাঁেক বাধ্য করা হয় গ্রুপের সদস্য হতে। মাদব্যবসায়ী নয়নের সাথে সখ্যতায় যোগ হয় নতুন মাত্রা। মাদকের সাথে জড়িয়ে পরে রিফাত। এরপর আর পিছু ফিরে তাঁকাতে হয়নি। গ্রুপ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন সহোদরদের নেতৃত্বে কলেজে ও বিভিন্ন ম্যাচে হানা দিয়ে ও ছাত্রদের মোবাইল জিম্মি করে অর্থ আদায় চলে। আর এসব অপকর্মের নালিশ আসলে বাবা দুলাল ফরাজী প্রথমে স্বীকারই করতেন না। তিনি বলতেন তাঁর ছেলেরা এমন কর্ম করতেই পারেনা। পরে প্রমান মিললেও সাফাই গাইতেন ছেলেদের পক্ষে। কেজিস্কুল এলাকার বেশ কয়েকটি ম্যাচের ছাত্রদের জানায়, রিফাত রিশানের কাজই ছিল নিয়মিত ম্যাচে হানা দিয়ে মোবাইল ও ল্যাপটট কেড়ে নেয়া। ম্যাচ মালিকদের বিষয়টি জানালে তারা রিফাতের বাবা দুলাল ফরাজীকে ডেকে পাঠাতেন। সবসমই দুলাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ছেলেদের সাফাই গাইতেন। শহরের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা আজীম মোল্লা জানান, মাস খানেক আগে দীঘির পাড় এলাকার তাঁর একটি ম্যাচ থেকে ১৪টি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ কেড়ে নেয় রিফাত বাহীনি। বিষয়টি বাবা দুলাল ফরাজীকে জানালে তিনি এর পক্ষে প্রমান চান। প্রমান দিলেও তিনি ছেলেদের পক্ষাবলম্বন করে নির্লিপ্ত থাকেন। পরে আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে একটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়। আজিম বলেন,‘ওদের বাবা দুলালের কারণেই আজ ছেলেদের এই দশা, ছেলেদের শাসন তো দূরে থাক, পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতেন। এমনকি লেলিয়ে দিয়ে অভিযোগকারীকে অপদস্তও করতেন। ক্রোক এলাকার জাকির হোসেন বলেন, এই এলাকার এমন কোনো ছাত্রদের ম্যাচ নেই যেখানে হানা দেয়নি দুলালের ছেলেরা। আমি বেশ কয়েকবার মোবাইল উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। দুলাল ফরাজীর আষ্কারায় ছেলেরা দিনে দিনে তাঁর ছেলেদের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে আজ এত বড় ঘটনার জন্ম হয়েছে।

ধানসীঁড়ি সড়কের রিফাত রিশানের বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী কয়েকজনের সাথে কথা হয়। সড়কের দক্ষিণ প্রান্তের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘দুলাল কোনো কাজকর্ম করতোনা। ছেলেদের দিয়ে এসব করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সে টাকায় সে চলত। যে কারণে ছেলেদের ব্যাপারে কেউ নালিশ নিয়ে গেলে তাঁে উল্টো ছেলেদের সামনেই ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হত। ওর ছেলেদের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিল।

ফেরার পথে কথা হয় একজন নারীর সাথে। দুলাল ফরাজী ও তার ছেলেদের সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, তিনি দুলাল ফরাজির বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। ছেলেদের বিরুদ্ধে নালিশ এলে রিফাত ও রিশানকে বকঝকা করতেন মা রেশমা বেগম। দুলাল ফরাজি তখন ছেলেদের পক্ষ নিয়ে উল্টো তার স্ত্রীকে মারধর করতে। দুলাল ফরাজী ছেলেদের অপকর্মের পক্ষ নেয়া কারণ ছিল তার ছেলেরা ‘কামাইয়ের পুত’।

অভিভাবকদের এমন নৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কে কথা হয় বরগুনা জেরা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামালের সাথে। তিনি বলেন, পারিবারিক অনুশাসন না থাকলে বেশীরভাগ সন্তানই বখাটে হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পরে। রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের নির্মমতা প্রমান করেছে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় কতটা নিম্মগামী। এ ঘটনার জড়িতদের অনেক অভিভাবকই ছেলেদের ব্যাপারে উদাসিন ছিলেন। ঘটনাটি থেকে সব অভিভাবকের শিক্ষা নেয়া উচিত।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!