‘মোগো লইগ্যা এক বোতল বিষ পাডাইয়া দেন, খাইয়া বেবাক্কে মইর‌্যা যাই’

0
IQSHA IT

রুদ্র রুহান, বরগুনাঃ ‘হুনছি সরকার মোগো মাছ ধরতে মানা হরছে, আইন করছে বোলে সিজনের দুই মাস মাছ ধরতে দেবেনা, মাছ ধরা মোগো পেশা, এই মাছ ধইর‌্যা গুরাগারা লইয়া কয়ডা ডাইল ভাত খাই। এহন যদি সরকার মাছ ধরতে না দেয় তয় হ্যাগো কন মোগো লইগ্যা এক বোতল বিষ পাডাইতে, খাইয়া বউ গুরাগারা লইয়া মইর‌্যা যাই”। কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ জেলে মজিদের। ‘৬৮ বছর বয়স অইছে, ৪০ বচ্ছরই এই গাঙ সাগরে ভাইস্যা ভাইস্যা মোর জীবনডা গ্যাছে’। সম্প্রতি গভীর সমুদ্রসহ উপকূলীয় এলাকায় ৬২ দিন মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই গোটা উপকূলীয় এলাকার জেলেরা মজিদের মতই স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন।

বরগুনাসহ উপকূলীয় এলাকায় মোট ৭ লাখ ৭০ হাজার জেলের বৈশাখ মাসজুড়ে প্রস্ততি নেয় ইলিশ শিকারের। জাল নৌকা ঠিকঠাক করে সব কিছু গুছিয়ে জৈষ্ঠ’র
শুরুতে নদী ও সাগরে ইলিশ শিকারের মহারণের অবর্তীণ হয়। বৈরী আবহাওয়া, ঝড় ঝঞ্জা আর পাহাড়সম ঢেউয়ে ভেসে ভেসে ইলিশ শিকার করে। এসব ইলিশ চলে যায় দেশের সীমনা পেড়িয়ে দেশের বাইরে। আন্তর্জাতিকভাবে ইলিশের স্বীকৃতমালিকানা এখন বাংলাদেশের।

সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুসারে বঙ্গোপসাগরসহ উপকূলীয় এলাকায় ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিন সব ধরনের মাছ শিকার বন্ধ রাখতে হবে। ফের
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে পরবর্তি ২২দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ থাকে। এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হতে না হতেই ১
নভেম্বর থেকে পরবর্তি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা (৩০ সেমি. দৈর্ঘের ইলিশ) ধরার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অর্থাৎ, বর্তমান মৌসুমে জেলেদের ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে গোটা বছরই আর মাছ শিকারের সুযোগ থাকেনা। এ অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় জেলেরা।

জেলেরা জানান, জৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময় থেকে পরবর্তি দু’মাস ইলিশ শিকারের ভরা মৌসুম। এসময় বঙ্গোপসাগর ও আশাপাশের নদ-নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। প্রতিবছর গভীর সমুদ্র থেকে যাতে ইলিশ অবাধে বিচরণ করে বঙ্গোপসাগর ও আশপাশে আসতে পারে সে কারণে গভীর সমুদ্রে ফিশিং ট্রলিগুলোর উপর ওই ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত থাকে। কিন্ত চলতি বছরে সরকার ফিশিং ট্রলার ও প্রান্তিক জেলেদের ও এর আওতায় এনে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে জেলেদের মাছ শিকার এক প্রকার বন্ধই রাখারই উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে সম্মিলিতভাবে মাঠে নেমেছেন উপকূলীয় মৎস্যজীবিরা। মানববন্ধন বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন কয়েক দফায়।

বরগুনা জেলা সমিতি সভাপতি দুলাল হোসেন বলেন, উপকূলীয় জেলেরা সবসমই সরকারের বিধি মেনে মাছ শিকার করে। এবার আমাদেরকে ট্রলির সাথে একাকার করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। মাছ শিকার না করতে পারলে হাজার হাজার জেলের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চাই, আমরা চাই সরকার বাস্তবতার আলোকে বিধিতে পরিবর্তন আনবে।

বরগুনার জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরি বলেন,ট্রলি মালিকেরা প্রতিবছর গভীর সমুদ্রে নিয়ম লংঘন করে ইলিশ শিকার করে। তারা সরকারকে ভুল বুঝিয়েছে। ট্রলারগুলো বঙ্গোপসাগরের দেড় থেকে দু’শ কিলোমিটার গভীরে অবস্থান নিয়ে ইলিশ শিকার করে ফিরে আসে। এতে ইলিশের গতিপথে কোনোরকম বিঘ্ন সৃষ্টি হয়না। এ অবস্থায় আমাদের উপর নিষেধাজ্ঞা সরকার পুনঃবিবেচনা করবে বলে আমাদের বিশ্বাস ও দাবি।

পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পাইকার ও আরৎদার সমিতির নেতাদেরও দাবি,সরকার সিদ্ধান্তটি পুন বিবেচনা করে মৎস্যজীবিদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভুমিকা রাখবে। আরৎদার সমিতির নুরুল আমিন বলেন, মৌসুমকে ঘীরে আমরা কোটি
কোটি টাকা ব্যবসায় লগ্নি করে রেখেছি। সরকারের রাজস্ব খাতেও প্রায় কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। ভরা মৌসুমে যদি জেলেরা ইলিশ শিকার না করতে পারে তবে সবাইকে পথে বসতে হবে।

যোগাযোগ করা হলে বরগুনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, জেলেদের দাবি দাওয়ার বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহন করবে সে অনুসারেই আমরা পদক্ষেপ গ্রহন করবো।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!